হৃদরোগ চিকিৎসার নেতৃত্বে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন
রাজবংশী রায়
হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখার প্রত্যয় নিয়ে তিন যুগ আগে মিরপুরে পথচলা শুরু হয়েছিল ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের। ১৯৭৮ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুল মালিকের নেতৃত্বে কিছুসংখ্যক চিকিৎসক ও সমাজকর্মী মিলে মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে গড়ে তুলেছিলেন এ প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সেই প্রতিষ্ঠানটিরই দেশে হৃদরোগ চিকিৎসায় বিপুল অবদান রয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুল মালিকের নেতৃত্বে দেড় শতাধিক নবীন-প্রবীণ চিকিৎসকের নিরলস পরিশ্রমে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল দেশের হৃদরোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসাসেবায় অনন্য ভূমিকা পালন করে চলছে। চিকিৎসা প্রার্থীরাও এ প্রতিষ্ঠানের সেবার মান নিয়ে সন্তুষ্ট। এখানে শতকরা ৩০ ভাগ রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
মিরপুরের দারুসসালাম রোড এলাকার বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম বলেন, এক বছর আগে তার মা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
সেখানে চিকিৎসকদের অবহেলায় মায়ের চিকিৎসা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। পরে এক প্রতিবেশীর পরামর্শে ফখরুল তার মাকে হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি করান। সেখানে ওপেন হার্ট সার্জারি করার পর তার মা এখন সুস্থ।
মিরপুরের পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা মফিজুর রহমান নিয়মিত এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেন। তিনি সমকালকে বলেন, কয়েক মাস আগে তিনি ওপেন হার্ট সার্জারি করিয়েছেন। ১০ দিনের প্যাকেজে তার মাত্র দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অন্যান্য হাসপাতালে এ খরচ দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানা গেছে,রাজধানীর মিরপুরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ সারাদেশে ৩৩টি এফিলিয়েটেড বডি বা অধিভুক্ত সমিতির মাধ্যমে হৃদরোগ আক্রান্তদের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠান সরকারের পাশাপাশি দাতা সংস্থা ও দানশীল ব্যক্তিদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তিনশ' শয্যার এ হাসপাতালে চারটি অপারেশন থিয়েটার, তিনটি ক্যাথল্যাব, ১৬ শয্যার করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) এবং ১৬ শয্যার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), সার্বক্ষণিক বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ,অন্তর্বিভাগ, সব ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম,সিটিস্ক্যান, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ইটিটি ও ডায়ালাইসিস পরীক্ষাসহ সর্বাধুনিক চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে।
হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা নেওয়া কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারি রোগীর মৃত্যুর হার শতকরা দুই ভাগেরও কম, যা উন্নত বিশ্বের সমতুল্য।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে সবচেয়ে বেশি হার্টের অপারেশন এবং ইন্টারভেনশনাল প্রসিডিউর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে হয়ে থাকে। ১৯৯৯ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ৮৫ হাজার ১৭৫টি বিভিন্ন ধরনের ইনভেসিভ পরীক্ষা এবং ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা হার্ট ফাউন্ডেশনে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ হাজার ৮৮৮টি এনজিওগ্রাম, ১৭ হাজার ৯৬৯টি এনজিওপ্লাস্টি, দুই হাজার ৭৮৬টি ভালভোপ্লাস্টি, এক হাজার ৬৭৯টি স্থায়ী পেসমেকার, তিন হাজার ৩৬৫টি কার্ডিয়াক ক্যাথ, ২৬৭টি রেনাল এনজিওগ্রাম,৩৫৪টি পেরিফেরাল এনজিওগ্রাম এবং এক হাজার ৮৬৭টি অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে, কার্ডিয়াক সার্জারির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে এ হাসপাতালে ১৭ হাজার ৮৪৮ জনের হার্ট সার্জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৩৪৩ জনের ওপেন হার্ট সার্জারি ও এক হাজার ৫০৫ জনের ক্লোজড হার্ট সার্জারি করা হয়েছে।
চিকিৎসার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য নিয়মিত চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এ হাসপাতালে এমডি (কার্ডিওলজি) ও এমএস (কার্ডিওথোরসিক সার্জারি) কোর্স চালু রয়েছে। হার্ট ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জনগণকে শিক্ষিত ও উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন গণমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
হার্ট ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম শুধু রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৩৩টি স্থানে হার্ট ফাউন্ডেশনের এফিলিয়েটেড বডি বা অধিভুক্ত সমিতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সভাপতিসহ ৩৪ সদস্যের একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ ও ১৬ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে হার্ট ফাউন্ডেশন পরিচালিত হচ্ছে। হৃদরোগ ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এসব সমিতিতে বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম করা হয়। এ প্রোগ্রামকে দেশের সব জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
নাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুল মালিক সমকালকে বলেন, হৃদরোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকার বা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে হৃদরোগ প্রতিরোধ ও এর চিকিৎসায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে হার্ট ফাউন্ডেশন সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। বেসরকারি উদ্যোগে আরও মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচিত বলেন মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নুরুল হক সমকালকে বলেন,সরকারের একার পক্ষে অধিকসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। হার্ট ফাউন্ডেশনের মতো বেসরকারি উদ্যোক্তারা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র পাল্টে যাবে।








0 comments:
Post a Comment