Wednesday, February 25, 2015

মৃত্যুঞ্জয়ী নারীঃ বীরকন্যা প্রীতিলতা

মৃত্যুঞ্জয়ী নারীঃ বীরকন্যা প্রীতিলতা

সুরজিৎ সিংহ


তত্কালীন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামে যারা নিঃশঙ্কুচিত্তে আত্মাহুতি দিয়েছেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার অন্যতম। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার এর ৭৯ তম আত্মাহুতি দিবস। এ দিনটিতে ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণে সফল অভিযান শেষে তিনি গুলিবিদ্ধ আহত অবস্থায় "পটাসিয়াম সায়ানাইড" বিষ পানে আত্মাহুতি দেন।
ধলঘাট, চট্টগ্রামের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে। বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দাদার ছিলেন মিউনিসিপ্যাল আপিসের হেড কেরানী।
প্রীতিলতা, যে মেয়ের জন্ম সংবাদ শুনে বাড়িতে নেমেছিল এক শোকের ছায়া। কালো এবং মেয়ে বলে তাঁর জন্মে মন খারাপ হয়েছিল বাবা ও আত্মীয় স্বজনের| মা আদর করে যার নাম রেখেছিলেন "রাণী"। স্বামীকে বলেছিলেন আমার কালো মেয়ে দেখো একদিন সবার মুখ আলো করবে। "মায়ের আত্মবিশ্বাসকে সত্যে পরিণত করেছেন প্রীতিলতা । তিনি হয়েছেন স্বাধীনতাকামীদের কাছে এক আদর্শ স্থানীয়া, দেশপ্রেমিক বীরাঙ্গনা। অমর হয়েছেন বাংলাদেশ-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে" । সেই কৈশোর থেকেই বৃটিশ ঔপনিবেশিকতা, তাদের শোষণ-অত্যাচার, নির্যাতন প্রীতিলতাকে তাড়িত করতো। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন ধীরে ধীরে। কৈশোরের শুরুতেই যখন সে ডাঃ খাস্তগীর স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী তখন একটি ঘটনা প্রত্যক্ষকরণ তাঁর চেতনাকে নাড়া দিয়েছিল। সে প্রত্যক্ষ করেছিল, বিশিষ্ট স্বাধীনতাকামী নেতা অম্বিকাচক্রবর্তী এবং উমাতারা উচ্চ ইংরেজী স্কুলের অংকের শিক্ষক সূর্যসেনকে পুলিশ কর্তৃক রেলওয়ের টাকা ডাকাতির দায়ে গরুর গাড়ির ওপর বসিয়ে নির্মমভাবে মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া। যাদেরকে আদালত নির্দোষ প্রমাণ করে বেকসুর খালাস দিয়েছিল। আরেকটি বিষয় তাঁকে দারুণ ব্যথিত করতো, তা হলো বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী-পুরুষের বৈষম্য। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী প্রীতিলতা তাঁর এক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় সুবল দাদার কাছ থেকে পরোক্ষভাবে বিপ্লবী সংগ্রামের প্রেরণা লাভ করেন। সেই দাদা তত্কালীন নিষিদ্ধ বইগুলো এনে প্রীতিলতাকে গোপন সংরক্ষণে রাখতে দিত। "ক্ষুদিরাম", "কানাইলাল", "বাঘা যতীন", "দেশের কথা", "সরকারী রাউলাট কমিশন রিপোর্ট"-এসব পড়ে তাঁর ক্ষোভ ক্রমেই বাড়তো। এরই মাঝে প্রীতিলতা ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে। এ সময়ে ঐ মেয়ে কলেজের এক অধ্যাপিকা প্রীতিলতার মননশীলতা ও মেধার গভীরতা লক্ষ্য করে তাঁকে "দীপালী সংঘ" (শ্রী সংঘ নামক বিপ্লবী দলের মহিলা শাখা)-এর সদস্যা করার পরিকল্পণা করেন। "দীপালী সংঘ" এর সংস্পর্শে আসেন প্রীতিলতা। এতে তাঁর চেতনার ধার আরো শানিত হয়,তীক্ষ্ণ হয়। হয়ে ওঠেন আরো বিদ্রোহী সংগ্রামী। তিনি ভাবতেন, "ইংরেজরা আমাদের যা হুকুম করবে তা আমাদের মানতে হবে কেন? সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে ওরা এ দেশে আসবেই বা কেন ?আমাদের দাবড়াবে কেন?" যে বৃটিশ শাসকদের তাড়াতে গিয়ে ১৭৫৭-তে রাণী ভবাণী আর তার একশত বছর পরে রাণী লক্ষীবাই স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে অমর হয়েছেন। প্রীতিলতা স্বপ্ন দেখতেন রাণী ভবাণী আর লক্ষীবাই এর মত লড়াই করার। বিপ্লবী সংগ্রামে অংশ নয়ার তীব্র আকাঙ্খা ও জেদ নিয়ে তাঁর সুবল দাদাকে বলেন, "এতকাল আগে থেকে তাঁরা যদি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়তে পারে তবে আমি কেন পারবো না ? আমার খুব ইচ্ছে করছে ওদের মতো হতে। আমার ডাক নাম তো রাণী। নাটোরের রাণী আর ঝাসীর রাণী যা পেরেছিল চট্টগ্রামের রাণীও তা পারবে"। তাঁর পীড়াপীড়ি ও আগ্রহ দেখে সেই দাদা এ প্রসঙ্গে মাষ্টারদা সূর্যসেনের সাথে আলোচনা করেন। স্বভাবকোমল বাঙালী নারী সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য কোনক্রমেই উপযুক্ত নয়। এই ধারণা থেকে বিপ্লবী দলে নারী সদস্যা নেয়া হতো না। তথাপি অদম্য আগ্রহ, উত্সাহ এবং রাজনৈতিক সচেতনতার মাত্রা ও আন্দোলনের স্বচ্ছ ধারণা থাকার জন্যে প্রীতিলতাকে বিপ্লবী দলে সদস্যা করার সিদ্ধান্ত নেন মাষ্টারদা সূর্যসেন।
মাত্র সতের বছর বয়সে বিপ্লবী দলের সদস্যা হলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার। শুরু হয় তাঁর নতুন যাত্রা। ক্রমে ১৯২৯-এ তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আই.এ. পাশ করেন। বৃত্তি পান কুড়ি টাকার। ফলে তিনি দর্শন বিষয়ে বি.এ. অনার্শে ভর্তি হন কলিকাতার বেথুন কলেজে। ছাত্রীনিবাসেই থেকে তিনি এক বিশিষ্ট বিপ্লবী কর্মীর সহায়তায় সেখানে বিপ্লবী কর্মকান্ডের জাল বিস্তার করতে থাকেন। ১৯৩১, দেশে চলছে পরাধীরতার শৃংখল ছিন্ন করার সশস্ত্র সংগ্রাম, বিপ্লবীরা পাঞ্জা ধরছেন মৃত্যুর সঙ্গে। তখন বি.এ. অনার্স পরীক্ষা আসন্ন হলে তিনি মুক্তি সংগ্রামকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সকলের অনুরোধে তিনি পরীক্ষা দেন, তবে অনার্স নয় সাধারণ বি.এ. পরীক্ষা। এই পরীক্ষায়ও তিনি সম্মানের সঙ্গে ( ডিস্‌টিঙ্কশনে ) পাশে করেন। অতঃপর চট্টগ্রামে ফিরে এসে তিনি একটি ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধাণ শিক্ষয়িত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। আর পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি মুক্তি সংগ্রামে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এ সময় দেশকে স্বাধীন করার জন্যে, সাফল্যে পৌঁছার লক্ষ্যে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযার শুরু হলে তিনিও এসব অভিযানে অংশ নেয়ার কঠিন পণ গ্রহণ করেন। বাংলার বিপ্লবীদের সশস্ত্র সংগ্রামে কোন বিপ্লবী নারীর সাক্ষাৎ লড়াইয়ে অংশ না নেয়া এবং শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ না করার বেদনা তাঁকে অধীর করে তুলতো। এই ব্যর্থতাকে তিনি নিজেরই ব্যর্থতা বলে মনে করতেন। এবং সাক্ষাত সশস্ত্র বিপ্লবী কোন কাজে যোগদানের জন্য তিনি নেতৃবৃন্দের কাছে ক্রমাগত দাবী জানিয়ে এসেছেন। অবশেষে তিনি পেলেন সেই সুযোগ। নির্ধারিত হলো ২৩ সেপ্টেম্বর' ১৯৩২ রাতে পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ অভিযানের। মাষ্টারদা সেই আক্রমণের নেতৃত্বের ভার দিলেন প্রীতিলতাকে। প্রীতিলতা ও তাঁর পাঁচজন সহযাত্রী এই অভিযানের জন্য প্রস্তুত হলেন। অভিযান শাণিত হলো নির্ধারিত সময়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রীতিলতা ও তাঁর সহযোদ্ধারা অভিযানের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করলেন। দলনেত্রী প্রীতিলতা সহযোদ্ধাদের প্রত্যাবর্তনের হুকুম দিলেন। সামরিক নীতি অনুযায়ী তিনি ছিলেন দলের পিছনে। আক্রমণের সময় এক ইংরেজ যুবক ক্লাব সংলগ্ন এক বড় নালায় লম্বা হয়ে শুয়ে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। বিপ্লবীরা তাদের কাজ শেষ করে চলে যাচ্ছে দেখে সে ওখান থেকেই সবার পিছনে পাগড়ি মাথায় পোষাক পরা প্রীতিলতাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। নিষ্ঠুর বুলেট প্রীতিলতার বুকে আঘাত হানে। ধূলায় লুটিয়ে পড়ে সেনাপতির রক্তাক্ত দেহ। আহত অবস্থায় বিপ্লবীদের শত্রুপক্ষের হাতে ধরা না পড়ার কঠোর নীতি ছিল। তাই প্রীতিলতাও তাঁর কর্তব্য সেই অবস্থায় স্থির করে ফেলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর লক্ষ্যে তিনি তাঁর পকেট থেকে বিষের মোড়কটি খুলে নিজের মুখের মধ্যে ফেলে দেন। মুহূর্তেই অসমসাহসিকা প্রীতিলতার দেহ হয়ে যায় নিথর নিশ্চল। তাঁর মৃত দেহের পোষাকের মধ্যে স্বহস্তে লিখিত একটি বিবৃতি পাওয়া যায়। তাতে তিনি বিশেষ করে নারী সমাজের প্রতি লিখেছিলেন "..... দেশের মুক্তি সংগ্রামে নারী ও পুরুষের পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করিয়াছিল। যদি আমাদের ভাইয়েরা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে পারে, আমরা ভগিনীরা কেন উহা পারিব না ? ..... নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়াছে যে, আমার দেশের ভগিনীরা আজ নিজেকে দূর্বল মনে করিবেন না। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সহস্র বিপদ ও বাঁধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন-এই আশা লইয়াই আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।" নিপীড়ক সমাজে দাসত্বের শৃংখল আর বৈষম্যের হাত থেকে থেকে নারীমুক্তির সংগ্রামে প্রীতিলতার চেতনা বড়ই প্রয়োজন। তাঁর শেষ আহবান এ সংগ্রামের পাথেয়। প্রীতিলতার যোগ্য উত্তরসূরী হোক আজকের নারীরা।
২৩-০৯-২০১১.

0 comments:

Post a Comment