Friday, February 13, 2015

স্বাস্থ্য

উচ্চ রক্তচাপে করণীয়
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
ডিন, মেডিসিন অনুষদ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
দৈনিক সমকাল   প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪

উচ্চ রক্তচাপ একটি স্থায়ী রোগ হিসেবে বিবেচিত প্রায়। এর জন্য চিকিৎসা ও প্রতিরোধ দুটোই জরুরি। না হলে বিভিন্ন জটিলতা, এমনকি হঠাৎ মৃত্যুরও ঝুঁকি থাকে। স্বাভাবিক রক্তচাপ হলো সেই বল, যার সাহায্যে রক্ত শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে। হৃৎপিণ্ডের পাম্পিং ক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তচাপ তৈরি হয়। রক্তচাপের কোনো একক নির্দিষ্ট মাত্রা নেই। বিভিন্ন বয়সের সঙ্গে একেকজন মানুষের শরীরে রক্তচাপের মাত্রা ভিন্ন ও একই মানুষের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিক এই রক্তচাপও ভিন্ন হতে পারে। উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, অধিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের ফলে রক্তচাপ বাড়তে পারে। ঘুমের সময় এবং বিশ্রাম নিলে রক্তচাপ কমে যায়। সাধারণত বয়স যত কম, রক্তচাপও তত কম হয়। যদি কারও রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি হয় এবং অধিকাংশ সময় এমনকি বিশ্রামকালীনও বেশি থাকে, ধরে নিতে হবে তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী।


উচ্চ রক্তচাপ ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। এটাই উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে ভীতিকর দিক। যদিও অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের রোগীর বেলায় কোনো লক্ষণ থাকে না, তবুও নীরবে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ জন্যই উচ্চ রক্তচাপকে 'নীরব ঘাতক' বলা যেতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত এবং চিকিৎসাবিহীন উচ্চ রক্তচাপ থেকে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ থেকে জটিলতা: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি অঙ্গে মারাত্মক ধরনের জটিলতা হতে পারে। যেমন হৃৎপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদযন্ত্রের মাংশপেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। দুর্বল হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে পারে না। এ অবস্থাকে বলা হয় হার্ট ফেইলিওর। রক্তনালির গাত্র সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা ইনফার্কশন হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, মস্তিষ্কে স্ট্রোক হতে পারে, যা থেকে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। এ ছাড়া চোখের রেটিনাতে রক্তক্ষরণের কারণে অন্ধও হতে পারে মানুষ।

উচ্চ রক্তচাপের কারণ: ৯০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। একে প্রাইমারি বা এসেন্সিয়াল রক্তচাপ বলে। সাধারণত বয়স্ক মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়ে থাকে। কিছু বিষয় উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা বাড়ায়। সাধারণত বংশানুক্রম, ধূমপান, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, অধিক ওজন, অলস জীবনযাত্রা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মদ্যপান, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা ছাড়াও কিডনির রোগ, অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার, ধমনীর বংশগত রোগ, গর্ভধারণ অবস্থায় অ্যাকলাম্পসিয়া ও প্রি-অ্যাকলাম্পসিয়া, অনেক দিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ব্যবহার, স্টেরয়েড জাতীয় হরমোন গ্রহণ এবং ব্যথা নিরামক কিছু ওষুধ খেলে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে করণীয়: জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বংশগতভাবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা কমানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে যেসব উপাদান নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেগুলোর ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। এ জন্য অতিরিক্ত ওজন কমানো, খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন যেমন কম চর্বি ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ, খাসি বা গরুর মাংস, কলিজা, মগজ, গিলা, গুর্দা, ডিম কম খেতে হবে। কম তেলে রান্না করা খাবার এবং ননী তোলা দুধ, অসম্পৃক্ত চর্বি যেমন সয়াবিন, ক্যানোলা, ভুট্টার তেল অথবা সূর্যমুখীর তেল খাওয়া যাবে। বেশি আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা ভালো। আটার রুটি ও সুজি জাতীয় খাবার পরিমাণমতো খাওয়া ভালো। লবণ নিয়ন্ত্রণ, মদ্যপান পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান বর্জন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলাতে হবে। এ ছাড়া নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। যত আগে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে, তত আগে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং জটিল রোগ বা প্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। উচ্চ রক্তচাপ সারে না। একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ জন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে। তাদেরকে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং নিয়মিত চেকিংয়ে থাকতে হবে।

0 comments:

Post a Comment